Skip to main content

গল্পটি একজন বাদশাহ ও একজন দাসীর

 


গল্পটি একজন বাদশাহ ও একজন দাসীর। গল্পটি এ রকম: এক বাদশাহ শিকারের জন্য একদিন জঙ্গলে গিয়ে অপরূপ সুন্দরী এক দাসীকে দেখতে পেলেন। দেখামাত্র বাদশাহ তার প্রেমে পড়ে গেলেন। জঙ্গল থেকে দাসীকে ধরে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু রাজপ্রাসাদে এসে সেই দাসী অসুস্থ হয়ে নাওয়া–খাওয়া সব ছেড়ে দেয়। বাদশাহ দাসীর অসুস্থতায় চিন্তিত হয়ে পড়েন। দাসীকে সুস্থ করার জন্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হেকিম এনে দেখাতে থাকেন। কিন্তু কেউ দাসীকে সুস্থ করতে পারে না। বাদশাহ নিরাশ হয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। রাতে বাদশাহ স্বপ্নে দেখলেন, পরদিন সকালে রাজদরবারের দরজায় একজন বৃদ্ধ বিজ্ঞ হেকিম আসবেন। তিনিই এই দাসীকে সুস্থ করতে পারবেন। পরদিন সকাল হতেই একজন বৃদ্ধ হেকিম রাজদরবারে এলেন।বাদশাহ হেকিমকে দাসীর অবস্থা সব বুঝিয়ে বললেন। হেকিম বললেন, আমিই এই অসুখের চিকিৎসা করতে পারব। হেকিম দাসীর সঙ্গে একান্তে কথা বলার অনুমতি চাইলেন। দাসীর সঙ্গে কথা বলে হেকিম জানতে পারলেন, জঙ্গলে থাকা অবস্থায় একজন স্বর্ণকার ছেলের সঙ্গে দাসীর প্রেম ছিল। সেই স্বর্ণকারের বিরহেই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হেকিম বাদশাহকে দাসীর বৃত্তান্ত সব জানালেন এবং ওই স্বর্ণকার ছেলেকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করলেন। হেকিমের অনুরোধে বাদশাহ সেই স্বর্ণকারকে অনেক টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে রাজদরবারে নিয়ে এলেন। স্বর্ণকারকে রাজদরবারে দেখামাত্র দাসী সুস্থ হয়ে গেল। আগের মতো আনন্দে রাজদরবারে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এবার হেকিম স্বর্ণকার ছেলের খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দিতে শুরু করলেন। বিষের প্রভাবে স্বর্ণকারের চেহারা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। স্বর্ণকার ছেলের চেহারা যতই নষ্ট হতে লাগল, দাসীর অন্তরে স্বর্ণকারের প্রতি প্রেমও তত কমে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে দাসী বাদশাহর প্রেমের প্রতি আকৃষ্ট হলো। এভাবেই দাসী একদিন স্বর্ণকারকে ভুলে গিয়ে বাদশাহর মন জয় করে নিল।

গল্পটি শুনতে নিছক একটি প্রেমের রূপকথা মনে হলেও এই গল্পে পবিত্র কোরআনের দুটি আয়াতের প্রতিফলন দেখা যাবে। ঘটনাটি পবিত্র কোরআনের সুরা হাদিদের ২০ নম্বর ও সুরা কাহাফের ১৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, আত্মপ্রশংসা ও ধনে-জনে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা (সেই) বৃষ্টি, যা উৎপন্ন শস্যসম্ভার দিয়ে অবিশ্বাসীদের চমৎকৃত করে। তারপর তা শুকিয়ে যায়, আর তাই তুমি তাকে হলুদ বর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)

কোরআনে আছে, আল্লাহ যাকে সৎ পথে পরিচালিত করবেন, সে সৎ পথ পাবে। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করবেন, আপনি তার জন্য পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবেন না। (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১৮)

এই আয়াত দুটির ব্যাখ্যা রুমির এই গল্পে পাওয়া যাবে। এখানে তিনি বাদশাহকে স৶ষ্টার সঙ্গে এবং স্বর্ণকার ও দাসীকে একজন সালেক বা তরিকার পথের পথযাত্রীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। বৃদ্ধ হেকিমকে মুর্শিদ বা পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় উপস্থাপন করেছেন। রুমি বলতে চেয়েছেন: একজন মুর্শিদ তার সালেকের চোখে দুনিয়াকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন না করা পর্যন্ত সে আল্লাহর প্রেমিক হতে পারবে না। এখানে মুর্শিদরূপী হেকিম যখন সালেকরূপী দাসীর সামনে দুনিয়ারূপী স্বর্ণকারের চেহারাকে নষ্ট করে দিলেন, তখন সেই দাসী স্রষ্টারূপ বাদশাহর প্রেমের প্রেমিকা হয়ে গেলেন।

ড. আহসানুল হাদী: সহযোগী অধ্যাপক, ফারসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...