১)আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো একটা সাবজেক্টে পড়াশুনা করতেন। বিয়ের পরে জানতে পারি ইন্টারের পরে ইউনিভার্সিটির পড়াশুনা তিনি আর করতে চাননি। কয়েকটা কারণে—ছেলেমেয়ে সহশিক্ষা, বিভিন্ন পরীক্ষা এবং ভাইবাতে পুরুষ শিক্ষকদের নেকাব খুলতে বাধ্য করা ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর বাবা-মা এতে একদম রাজি নন। যেহেতু তারা প্র্যাকটিসিং নন এবং পর্দা-হিজাবের গুরুত্বের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিটা তাদের কাছে অধিকতর গুরুতর, ফলে মেয়ের এহেন আবদারে তারা জিরো টলারেন্স নীতিতে থাকলেন। তবে হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন আমার স্ত্রী। বাবা মাসিক যে খরচাটা পাঠাতেন, সেখান থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে চুপিসারে একটা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে গেলেন। দ্বীনের বুঝ পাওয়ার পর থেকে তাঁর অনিঃশেষ ইচ্ছা কুরআন হিফয করবেন। তাই বাবা-মা’র চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা আর স্বপ্নের টানে হিফযের পড়া দুটোই চলতে লাগলো সমান্তরালে। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে তখন আমার বিয়ের প্রস্তাবটা পান। আমার যে বায়োডাটা তিনি পেয়েছিলেন তাতে বড় বড় করে লেখা ছিলো—স্ত্রী হিশেবে ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড নয় এমন কাউকেই আমার পছন্দ। অর্থাত—বাইরে চাকরি-বাকরি করার সবিশেষ ইচ্ছা রাখেন না এমন কেউ। বলে রাখা ভালো—এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত চাওয়া ছিলো। স্ত্রীর ভরণপোষণের, আবদার-ইচ্ছা সহ সমস্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণের গুরুভার ইসলাম আমার ওপরে অর্পন করেছে এবং সেটা আমি সঠিকভাবেই করতে চাই। আমি চেয়েছি আমার স্ত্রী চাকরি বা অন্য কোথাও যে সময়টা ব্যয় করবেন, সেটা তিনি দেবেন আমার সংসার, আমার বাচ্চা এবং পরিবারকে। যেহেতু ইউভার্সিটির পড়াশুনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিলো না তেমন (আমার স্ত্রী ছাত্রী হিশেবে যথেষ্টই ভালো ছিলেন), এবং বিয়ের প্রস্তাবে আমিও ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড কাউকে চাই না বলে জানলেন, তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে বিয়ের পরে ইউনিভার্সিটির পড়াশুনাটা আর চালিয়ে নেবেন না। যাহোক, আমাদের বিয়ে হয় এবং তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনার সেখানেই ইতি টানেন। কিন্তু—বিয়ের পরে আমি চেয়েছি আমার স্ত্রী পড়াশুনাটা চালু রাখুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কারণে ওখানে যেহেতু পড়েননি, আমাদের বিয়ের অল্পকিছুদিন পর তাঁকে আমি BIU (Bangladesh Islamic University) তে তাঁর একটা পছন্দের সাবজেক্টে ভর্তি করাই। প্রতি শুক্রবারে আমি তাঁকে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিতাম। তাঁর ক্লাশ চলাকালীন সময়টা ওখানেই কাটাতাম আমি এবং ছুটির পরে একসাথে বাসায় ফিরতাম। কিন্তু আমাদের বড় মেয়ে আয়িশা গর্ভে আসার পরে নানাবিধ জটিলতায় সেই পড়াশুনাটা কয়েকটা সেমিষ্টারের পরে আর চালু রাখা সম্ভব হয়নি। তাঁর আরবি ভাষা শেখার খুব ঝোঁক ছিলো। আমি শাইখ আবদুস সালাম আজাদী হাফিজাহুল্লাহর অনলাইন কোর্সে ভর্তি করিয়েছি যাতে স্বপ্নটা পূরণ করতে পারেন। কুরআনের হাফিযা হওয়ার তাঁর অদম্য ইচ্ছা। বিয়ের ঠিক পরপর তাঁকে আমি অনলাইনে একজন উস্তাযা ঠিক করে দিই যার কাছে তিনি প্রতিদিন পড়া দেন। আলহামদুলিল্লাহ, হিফয যাত্রায় আমার স্ত্রী অনেকটুকু পথ এগিয়ে গেছেন সবকিছু সামলে। তাঁর এই স্বপ্নযাত্রায় কতো নিবিড়ভাবে যে তিনি লেগে আছেন তার জ্বলন্ত সাক্ষী আমি নিজে। আলহামদুলিল্লাহ, বাচ্চাদেরকে সামলানোর বড় একটা দায়িত্ব আমি নিজে পালন করি শুধুমাত্র এই কারণে যে—যাতে তিনি হিফযের জন্য পর্যাপ্ত পড়তে পারেন, সময় দিতে পারেন। আলহামদুলিল্লাহ, তাঁর স্বপ্নের সারথী হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। না না, বউয়ের জন্য আমি কী কী করেছি আর আমি কতো ভালো স্বামী সেই ফিরিস্তি টানতে এই লেখা নয়। যা বলার জন্যেই এতো দীর্ঘ আলাপ, সেটা পরের অংশে বলছি। (২) আমাদের কমিউনিটির বড় একটা অংশের মাঝে বিয়েটা এখনো ফ্যান্টাসীর পর্যায়ে রয়ে গেছে। বিয়ে যে একটা বড় দায়িত্বের ব্যাপার, একটা সত্যিকার জীবনের শুরু যে আসলে বিয়ের মাধ্যমে হয়—এই বোধটা অনেকের মাঝে বড় বেশি দেখা যায় না। সচরাচর দেখা যায় দ্বীনে প্রবেশের পরে কারো মনে হলো যে ফিতনা থেকে বাঁচার জন্যে তার বিয়ে করাটা অবশ্যই জরুরি। এতোটুকু চিন্তা থেকে একজন মানুষ বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। কিন্তু বিয়েতে যে একটা শক্তপোক্ত প্রস্তুতি দরকার, বিয়ে যে একটা বিশাল বড় চ্যালেঞ্জের নাম—সেই চ্যালেঞ্জ কী, কীভাবে তা মোকাবেলা করতে হয় তা না জেনেই অনেকে বিয়ে করে ফেলেন। এরপর যা হয়—প্রথম কয়েকমাস খুব দূর্দান্ত কাটে। সমস্ত সময়টাকে মধু চন্দ্রিমার মতো মধুর লাগে। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর কেটে যখন বাস্তবতায় পা নেমে আসে, যখন জীবন তার সত্যিকার রূপ নিয়ে হাজির হয়, অনেকে ভড়কে যান। এই ভড়কে যাওয়ার কারণ বিয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত না করা। দেখুন, আমি এমন ঘটনাও জানি যেখানে একে-অন্যকে দেখাদেখি করে বিয়ে করার পর শুধু এই কারণ দেখিয়ে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায় যে—বিয়ের পর বউকে তার আর সুন্দর লাগে না। যেহেতু সুন্দর লাগে না, তাই সে আর তার সাথে সংসার করতে আগ্রহী নয়। এমন ঘটনার কথাও শুনেছি যেখানে একজন লোক তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছে এই কারণে যে স্ত্রী যথেষ্ট স্মার্ট নয়, ভালো ইংরেজি পারে না। ঘাবড়াবেন না, এগুলো আমাদের কমিউনিটির ঘটনা এবং এমন অপরিপক্ক চিন্তার লোকজনই এখানে বেশি। এখন চলেন একটা দৃশ্য কল্পনা করি। ধরুন একটা মেয়ে খুব বেশিদূর পড়াশুনা করলো না বা করতে চায় না। সে তার বাবা-মা’কে বোঝালো যে এসব পড়াশুনায় সে দরকারি কিছু খুঁজে পায় না (খুব যৌক্তিক)। তারচেয়ে বরং সে ঘর সংসার করতে চায়, বাচ্চাকাচ্চা বড় করতে চায়, একজন ভালো মা হতে চায়। তার বাবা-মা বললো—এতোটুকু পড়াশুনা করা মেয়েকে বিয়ে করবে কে? তখন বাবা-মা’র হাতে মেয়েটা একটা ছেলের সিভি ধরিয়ে দিয়ে বললো—ইনি এমন একজনকে খুঁজছেন যিনি মোটামুটি পড়াশুনা করা কিন্তু সাংসারিক হতে খুব আগ্রহী। বাবা-মা যেহেতু দ্বীনদার না, তারা এমন চিন্তার কূলকিনারা খুঁজে পান না। কিন্তু মেয়ে যেহেতু জিদ ধরেছে এবং প্রস্তাবও জোগাড় করে ফেলেছে—তাদের মেনে নিতে হয় এবং মেয়েটা পড়াশুনা অর্ধ-সমাপ্ত রেখে বিয়ে করে ফেলে। এখন ধরুন—বিয়ের কয়েক বছর যেতে না যেতেই তাদের সংসারটা টিকলো না। নানান কারণে সেটা না-ই টিকতে পারে। এমতাবস্থায় মেয়েটা যখন বাপের বাড়িতে উঠে আসে, বাবা-মা’র কাছে তার জায়গাটা তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? কীরকম মানসিক বঞ্চনা আর যন্ত্রণার শিকার হতে হবে তাকে? তাকে তার বাবা-মা বলবে—পড়াশুনাটা করতে বলেছিলাম তোমাকে, কিন্তু নিজের জেদে সেটা করোনি। আজকে বাবা-মায়ের কথা শুনলে এই অবস্থায় পড়াশুনাটা তো কাজে দিতো। (৩) ওয়েল, আমি আসলে বলতে চাইছি না যে মেয়েদের অতি-অবশ্যই অনার্স-মাস্টার্স পাশ করতে হবে। সার্টিফিকেট অর্জন করতেই হবে। কিন্তু আমি সমাজের এমন একটা অন্ধকার দিক নিয়ে আলাপ করতে চাইছি যা কখনো আলোয় আনা হয় না। ডিভোর্সটা আমাদের এখানে খুব সোজা। ছেলের মন চাইলো না ডিভোর্স দিয়ে দিলো। মেয়ের মন মানলো না ডিভোর্স নিয়ে নিলো। চারপাশে একটু খোঁজখবর নিলে দেখতে পাবেন কতো ঠুনকো কারণে, কতো অন্যায্যভাবে, কতো অনায়াসে এখানে সংসারগুলো ভেঙে যায়। স্বাভাবিকভাবে ডিভোর্সের ঘটনাগুলোতে একটা মেয়ে যেভাবে অসহায় হয়ে পড়ে, একটা ছেলে ততোটা নয়। ডিভোর্সের পরে একটা মেয়ে বাপের বাড়িতে যেমন নিগৃহীত হয়, তেমনি আরেকটা সংসার খুঁজে নেওয়াটা এখানে সমুদ্রতটের বালি থেকে সুঁই খুঁজে নেওয়ার মতোই শক্ত কাজ। কিন্তু ছেলেদের জন্য আরেকটা বিয়ে করাটা ততোটা কঠিন নয়। আমরা বাস করি একটা মিশ্র সমাজে। এখানে একটা ফ্যামিলির সবাই একসাথে প্র্যাকটিসিং, আবার কেবল একজন ছাড়া সবাই নন-প্র্যাকটিসিংও হতে পারে। সুতরাং আমরা যখন কোনো আলাপ করবো, এই মিশ্র সমাজের বাস্তবতাটুকু আমাদের মাথায় রাখাটা জরুরি। (৪) ধরুন আমি বললাম যে মেয়েদের মেট্রিকের পরে আর পড়াশুনা করা উচিত নয়। আমার এই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অজপাড়া গায়ের একটা মেয়ে যে সদ্য দ্বীনে ফিরেছে, যার পরিবারের কেউ দ্বীন সেভাবে পালন করে না এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সে আমার লেখালেখি দ্বারা প্রভাবিত। আমার কথা শুনে সে পড়ালেখা ছেড়ে দিলো এবং দ্রুত বিয়েও করে নিলো। আল্লাহ না করুন যদি অল্পদিন পরে তার সংসারটা অন্যায্য কারণে ভেঙে যায়, তার পরের জীবনটা কেমন হবে? সে বাবা-মা’র নিগ্রহের স্বীকার হবে। পড়াশুনা কেনো করলো না এটা নিয়ে উঠতে-বসতে কথা শুনবে এবং ধর্ম মানতে গিয়ে যে আসলে জীবনের বারোটা বাজিয়েছে (!) সেটা তারা তাকে ক্ষণে ক্ষণে বুঝিয়ে দেবে। একটা সময় তার বিষণ্ণ মনে এসব কথা প্রভাব পড়বে এবং সে ভাবতে শুরু করবে যে—পড়াশুনাটা ছেড়ে দেওয়াটা তার আদৌ উচিত হয়নি। সে তখন ভাববে—জীবনে কী ভুলটাই না করেছি আরিফ আজাদের কথা শুনে! এবং আমিও জানি— তার সেই বিষণ্ণতাবোধের কথা কোনোদিন আমার কান পর্যন্ত পৌঁছাবে না। ‘মেট্রিকের পরে মেয়েদের পড়াশুনা করা উচিত নয়’—এই কথাটা একজন আলিমের মেয়ের বেলায় যেভাবে কাজ করবে, একজন বেদ্বীন পিতার মেয়ের জন্য একইভাবে কাজ করবে না। বাবার ভালো পয়সাপাতি আছে, জমি-জমা আর ব্যবসাপাতি আছে এমন একটা ছেলের বেলায় ‘সার্টিফিকেট আসলে একটুকরো কাগজ ছাড়া আর কী’—বলাটা যতোখানি সহজ, একটা দিনমজুরের ছেলের জন্য সেটা ততোখানি সহজ নয়। এজন্যেই আমাদের অভিমতগুলো সমাজের সকল শ্রেণীকে সামনে রেখে হওয়া উচিত। (৫) আমার স্ত্রীর প্রতি যে কর্তব্যের কথা আমি বলেছি শুরুতে তা এজন্যেই যে—দূরের এবং কাছের সমস্তটা নিয়ে যাতে আমরা ভাবতে পারি, যাতে সকল সম্ভাবনা এবং সকল পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আমরা জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সাজাতে পারি। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা বিয়েটাকে নিছক ‘আবেগ’ দিয়ে না বুঝে, দায়িত্ব আর কর্তব্য দিয়ে বুঝবো। এটার জন্য বিয়েটাকে বাস্তবতা, পারিপার্শ্বিকতা, নিজের যোগ্যতা—সব স্কেল দিয়ে মেপে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মেয়েদের কতোটুকু পড়ানো উচিত আর কতোটুকু উচিত নয় সেই সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমি যেহেতু সকল ধরণের, সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে মিশি, আমাদের সমাজের এই মিশ্র-অবস্থাকে সামনে রেখে সিদ্ধান্তগুলো আসাটাই আমার কাছে জরুরি মনে হয়েছে। কেউ যদি মনে করে যে তার আসলে ইন্টার পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট এবং এতে করে জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিকে সে সামলে নিতে পারবে, তাহলে তার উচিত অবশ্যই ইন্টারের পর একাডেমিক পড়াশুনা বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু কেউ যদি নিজের পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটাকে সঠিক চিন্তা বলে মনে না করে, তাকেও আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারি না। আরিফ আজাদ

Comments
Post a Comment