ট্রানজিট নিয়ে এই পোস্টার অনেকে শেয়ার করায়, পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন মেসেজ ও প্রশ্ন এসেছে এবং কেউ কেউ ব্যাখ্যাও চেয়েছেন। মেসেজে আলাদা আলাদা উত্তর না দিয়ে এখানে ব্যখ্যা দিচ্ছি। কে এই পোস্টার করেছেন জানি না, তারা ইন্টারভিউতে দেয়া বক্তব্যের মোটামুটি সারাংশ করেছেন এবং এখানে আমার নামের বানান ভুল আছে একটু। by fayez ahmed tayab***** ভারতকে ট্রানজিট প্রশ্নে দেশে তিন ধরনের মতামত আছে। ১- ভারতকে ট্রানজিট দেয়া যাবে না। ২- যৌক্তিক ফিতে ট্রানজিট দেয়া উচিৎ এবং সেটা উইন উইন থাকতে হবে। ৩- বন্ধু রাষ্ট্রকে ফ্রি ট্রানজিট দেয়া। প্রথম ও দ্বিতীয় মত দুটা বিএনপিতে আছে। বিনিয়োগ বোর্ডে থাকাকালে মহামুদুর রহমান ট্রানজিটের বিরোধীতা করছেন। আমি বিএনপির একাধিক দায়ত্বশীল নেতাকে ট্রানজিট বিরোধী অবস্থানের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে শুনেছি। বিপরীতে বিএনপির ভিতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত হচ্ছে যৌক্তিক ফির বিনিময়ে ট্রানজিট এবং বিপরীতে শিলিগুড়ি করিডোর এবং ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার ল্যান্ডলক দেশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য। কেউ কেউ ট্রানজিটের সাথে পানির হিস্যাকে জুড়ে দিতে চান। যদিও একটা বাণিজ্য এবং অন্যটা ভাটির দেশের, প্রাণ ও প্রকৃতির অধিকার। আওয়ামীলীগের ভিতরে ট্রানজিট প্রশ্নে ২য় ও ৩য় মতামত রয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য অংশ ফির ব্যাপারে নমনীয় এবং অনেকেই ফ্রি ট্রানজিটের পক্ষে। একটা সময় সরকারের মন্ত্রীরা বলেছেন শুধু ট্রানজিটের আয় দিয়ে দেশ সিঙ্গাপুর হবে, সরকারি অর্থনীতিবিদ হিসেব কষে দেখিয়েছেন বিলিয়ন ডলার আয় হবে। অথচ বাস্তবায়নের কালে বলা হচ্ছে, বন্ধ রাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ নিব কেন! খোদ মন্ত্রীই বলেছেন বন্ধু দেশের কাছে ট্রানজিট চাওয়া অসভ্যতা। প্রশ্ন হচ্ছে, রাস্তা নির্মাণের ঋণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষনের খরচ কে দিবে? আমার ব্যক্তিগত অবস্থান কানেক্টিভিটির এই যুগে ট্রানজিট দেয়া চাই। যৌক্তিক ফির (অবশ্যই ডলারে হতে হবে) বিপরীতে, রাস্তা নির্মাণের ঋণের হিস্যা অনুপাতিক হারে শেয়ার, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ শেয়ার করে এবং শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয় বরং নেপাল ভূটান সব সমূদয় রিজিওনাল কানেক্টিভিটির সকল বাঁধা তুলে দেয়ার শর্তে বহুপাক্ষিক ট্রানজিট, করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট ফ্রেইমোয়ার্ক তৈরি করে ট্রানজিট দেয়া হোক। এবং অবশ্যই এর সাথে ছোট কোন দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতায় সমর্থনের আঁতত বন্ধ হোক। বহুপাক্ষিক ট্রানজিট, করিডোর, ট্রান্সশিপমেন্ট ফ্রেইমোয়ার্ক তৈরি না করে ট্রানজিট দেয়ার অর্থ হচ্ছে, আন্ডার টেবিল নেগোসিয়েশানের সুযোগ, যেখানে অবৈধ সরকার গুলো রাজনৈতিক ক্ষমতায় সমর্থনের শর্তে জাতীয় স্বার্থকে বেঁচে দেয় এবং সব সুবিধা শক্তিশালী দেশের অনুকূলে চলে যায়। এতে করে দুটা দেশের মধ্যে পিপপ টু পিপল কমিউনিকেশান টেকসই হয় না বরং এতে ঘৃণা এবং হতাশা বাড়ে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি বিদ্যুৎ করিডোরের বিরোধী কেননা এর সাথে যমুনা নদীতে বাঁধ দেয়ার বিষয় আছে, আবার এই বাঁধের সাথে ভারতের আন্তঃনদীস সংযোগ প্রকল্পের সংযোগ আছে। অর্থাৎ পানি প্রত্যাহারের প্রশ্ন জড়িত আছে বলে আমি বিদ্যুৎ করিডোরের বিরোধী। বিদ্যুৎ করিডোর দিলে যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের উজানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গুলো অর্থনৈতিক ভাবে ফিজিবল অর্থাৎ লাভজনক হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্বাদু পানির প্রধান উৎস যমুনা নদীকে হত্যা করা হবে। এটা ট্রানজিট প্রশ্নে আমার একেবারে হনেস্ট অপেনিয়ন। কথা প্রসঙ্গে বলি, আমি স্বীকার করি একটি সামান্য পরিসরে ট্রানজিট বিরোধীতার সাথে ভারত বিরোধীতার সংযোগ আছে। তবে সেটা দুর্বল সংযোগ। মূলত ভারত-বাংলাদেশের সড়ক ও নৌ ট্রানজিটের প্রধানতম বাঁধা অতীতের অভিজ্ঞতা। বর্তমানে যে ট্রানজিটের তোড়ঝোড় চলছে, তার বহু আগেই বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল ছিল। সম্ভবত জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই। কিন্তু ২০২০ সালের আগে নৌ রুট গুলো খুব একটা কাজ করত না। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সহ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ মন্ত্রী ও সচিবরা ভালই আবগত আছেন যে- তিনটি কারণে এই নৌ প্রটোকল কাজ করে না। ১। মূলত পানি প্রত্যাহার জনিত নাব্যতা সংকট, ২। ড্রেজিং খরচ ও কারিগরি সক্ষমতা ৩। নিন্ম রুট ফি। (গতবছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসামের গুয়াহাটিতে জয়েন রিভার এনক্লেভে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে এর ইংগিত আছে) অর্থাৎ ট্রানজিটের ফি যৌক্তিক না হলে ট্রানজিট নিজেই সাস্টেইনবল হয় না। ট্রানজিট থেকে আয়ের পথ ঠিক না করলে, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের টেকসই যোগান না হলে নতুন ট্রানজিটও সাস্টেইন করবে না। কারণ অর্থনৈতিক সংকটে থাকা আওয়ামীলীগও ক্রমাগত বিদেশি ঋণ নিয়ে ট্রানজিটের সড়ক ও নৌ রুটগুলা সচল রাখতে পারবে না। এর বাইরে আরেকটা বিষয় আছে, ভারতের এন্টি ডাম্পিং। বিএনপি আমলে রহিমাফ্রোজের ব্যাটারি বিক্রি বাড়ায় ভারত ব্যাটারি উপর এন্টি ডাম্পিং আরোপ করেছিল, এই নিয়ে রেশারেশি ও মামলা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা পর্যন্ত গিয়েছে এবং বিএনপিতে ট্রানজিট বিরোধী অবস্থান বেড়েছে। বর্তমানেও পাট ও পাটজাত পণ্য, মাছ ধরার জাল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের মত বেশ কিছু পণ্যে এন্টি ডাম্পিং নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ভারতের। ২০১০ সাথে ট্রানজিটের যে ফি দশ হাজার ছিল, সরকার সেটা ৫০০ টাকায় নামিয়েছে। অর্থাৎ ২০ ভাগের এক ভাগ। যদিও ২০১০ সালের ৫০০ টাকার বর্তমান মূল্য ২৫০ টাকার বেশি হবে না। ফলে ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ডলারে চুক্তি করা গুরুত্বপূর্ণ। আজকে যে ফি ধরা হয়েছে সেটা নামমাত্র- এটা টাকায় ধরা হয়েছে, টাকার মান দ্রুত পড়ছে বলে এই ফি থেকে বাংলাদেশের রাস্তা নির্মান, মেরামত, নিরাপত্তার খরচ উঠে আবসে না। ৪৩৫ কিমি রাস্তায় ভারতের খরচ হবে ১২ হাজার টাকা, এসব ভারী ট্রাক ৩-৪ বছরে চলার পর হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে মেরামত করতে।অথচ বাংলাদেশের একটা ট্রাক কে এর চেয়ে বেশি টাকা শুধু চাঁদাই দিতে হয়। রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এর উচ্চ খরচ বাদ দিলাম! এক ট্রাক মাল দিনাজপুর থেকে কক্সবাজার যেতে প্রায় ২২-২৫ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়- ফি ও টোল, পুলিশ, প্রশাসন, দলীয় নেতা, সমিতির চাঁদা মিলে। অর্থাৎ নীতিগতভাবে আমি ট্রাঞ্জিটের বিপক্ষে না। কিন্তু ট্রানজিট উইন উইন না হলে তখন একপেশে ট্রানজিটের বিরোধীতা করি কিংবা ভোটহীন ক্ষমতা সমর্থনের ব্যাক ডোর ট্রানজিটের সাথে যুক্ত হলে তার বিরোধীতা করি। আমরা মনে করতে পারি! এমনকি ট্রাঞ্জিটের ফি প্রস্তাবনা তৈরি করা কমিটির সচিবকেও ওএসডি করা হয়েছে। নামমাত্র মূল্যের ট্রাঞ্জিটে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অবকাঠামো এবং বাজেটের বিশাল ক্ষতি। হাজার কোটি টাকা খরচ করে এসব রাস্তা মেরামত ও নতুন নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে, এমনিতেই বাংলাদেশের নির্মাণ খরচ বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে বেশি, আমাদের হাই কষ্ট অফ ডেভেলপমেন্ট দেশের বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ তৈরি করেছে। আপনি বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ দিয়ে রাস্তা করবেন, মেরামত করবেন, ২ লেইন থেকে ৪ লেইন করবেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি ঋণের বোঝা টানবেন। কিন্তু সেই রাস্তা ব্যবহার ও নষ্ট করবে ট্রাঞ্জিটের হেভি ভেহিকল, ন্যায্য ফি না দিয়েই- এটা ইকোনোমিক্যালি ফিজিবল না। এটা আন সাস্টেইনেবল মডেল। রিজিওনাল কানেক্টিভিটি এবং বাণিজ্য সম্ভাবনাকে অবৈধ ক্ষমতায়নের হীন স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। রিয়েলি স্যাড!

Comments
Post a Comment