Skip to main content

পবিত্র কাবা শরীফে

 


আমার পুত্রের কাবা শরীফের প্রতি একধরনের অমোচনীয় আগ্রহ আছে। সে অনেক ছোটবেলা থেকেই সেখানে যেতে চায়। তাকে কথা দেয়া ছিলো যে একসময় তাকে মক্কাহ ও মদিনায় নিয়ে যাওয়া হবে।

সে গত দশ বছর এরও বেশি সময় রোজ জানতে চাইতো সে কবে কাবাঘরে যাবে। যেহেতু সে একজন বিশেষ শিশু তাকে এতদুর নিয়ে যাওয়ার জন‍্য ও সে যাতে পবিত্র স্থানে আদবের সাথে ভ্রমন সম্পন্ন করতে পারে সেজন‍্য তাকে প্রস্তুত করতে হয়েছে। একসময় সে উড়োজাহাজ ও শব্দকে তীব্র ভয় পেতো। তাকে নিয়ে বহুবার উড়োজাহাজ এ উঠে এই ভয় মোচন করতে হয়েছে। উড়োজাহাজের প্রসাধন ও প্রক্ষালনকক্ষে বিকট শব্দে ফ্লাশ হয়। ইমিগ্রেশনের ছবি ও আঙুলের ছাপ লাগে। এরকম বহু কিছুতে তাকে অভ‍্যস্ত করিয়ে নিতে হয়েছে। আমার পুত্র কোরআন শরীফের একটি বড় অংশ মুখস্থ করেছে। এসবই মহান স্রষ্টার করুণা। আমি এর আগে মোট এগারোবার উমরাহ সম্পন্ন করেছি। সবই বয়স ছত্রিশ হবার আগে। এরপর দীর্ঘদিন আমি সেখানে যাই নাই কারণ আমি আমার পুত্রের সাথে সেখানে যাবো বলে মনস্থ করেছিলাম। এরমাঝে আমি বেশ কয়েকবার সৌদি আরবে প্রভাবশালি কিছু নিকটজনকে আমার পুত্রের উমরাহকে সহজ করার জন‍্য সেখানে অবস্থানরত কোন সাহায‍্যকারি দিয়ে সহায়তা চাইলে তারা সযতনে সেটা এড়িয়ে যান। সেই সময় আমার পুত্র খুব ছটফটে স্বভাবের ছিলো। তাকে দেখে রাখতে আলাদা লোক লাগতো। সে এখন অনেক শান্ত হওয়ায় ভ্রমন সহজতর হয়েছে। আল্লাহ সেইসব নিকটজনকে চিনতে সাহায‍্য করেছেন। এখন কাবাঘরে প্রবেশের জন‍্য অবশ‍্যই ইহরামের পোশাক পরতে হয়। তাছাড়া মহানবীর রওজা মুবারক জিয়ারাত ও রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশের জন‍্য মোবাইল অ‍্যাপের মাধ‍্যমে নির্ধারিত সময়ে যেতে হয়। আমার ছেলে জায়নামাজ ছাড়া শক্ত মার্বেলে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে অস্বস্তি অনুভব করে। কখনো কখনো ভীড় এর কারণে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলে বাইরে দাঁড়াতে হতো। তাই সাথে তার জন‍্য একটি জায়নামাজ নিতে হতো। একটিবার ভুলে সেটি না নেয়ায় আমি যখন ভাবছি কি করবো; কোন এক অপরিচিত আরব কিশোর এসে তার নিজের জায়নামাজটি আমার পুত্রর জন‍্য বিছিয়ে দিয়ে তার পাশে দাড়িয়ে গেলো। কিভাবে এটা হলো আমি জানি না। এমন নয় যে আমি কাউকে বলেছি বা জায়নামাজ খুঁজেছি। আমার ছেলে আমাকে স‍্যার বলে আদর করে। আমিও স‍্যার বলি তাকে। সে একাই হেঁটে কিভাবে যেনো তাওয়াফের সময় কাবাঘরের গিলাফ ছুঁয়ে কোরানের আয়াত বলে দোয়া করেছে। তাকে এই ভীড়ে ধাক্কাধাক্কি করা আফ্রিকান ও ভারত পাকিস্তানের লোকজন নিজেরাই সরে গিয়ে পথ করে দিয়েছে। বলতে হয় নাই কাউকে। আমরা একসাথে সব ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানে দু রাকাত নামাজ পড়েছি। সে প্রতিবার নামাজ এর আগে ও পরে জমজমের পানি পান করার কথা ভুলে গেলেই মনে করিয়ে দিয়েছে। আমরা কাবাঘরের সীমানাতে একবেলা ঘুমিয়েও থেকেছি জোহর ও আসরের মধ‍্যবর্তি সময়ে। রাসুল সা. আ. এর রওজা মুবারকে প্রবেশের নির্ধারিত সময়ে লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর পর আমি যখন ভাবছি অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ঠিক তখনি বহুদুর থেকে শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা দুজন সৌদি নাগরিক এগিয়ে এসে আমার পুত্র ও আমাকে আলাদা করে নিয়ে গেলেন ও সময় হবার সাথে সাথে আলাদা দরোজা দিয়ে সরাসরি রিয়াজুল জান্নাতে নিয়ে প্রথম সারীতে দাঁড়াতে দিলেন। আমি কাউকে কোনো অনুরোধ করি নাই কিন্তু যখন আমার পুত্রের হাত ধরে উঁচু দরোজা পার হয়ে সেখানে যাচ্ছি তখন আমার মনে হলো এভাবেই হয়তো আমার পুত্রের হাতটি আল্লাহ আমার জন‍্য নির্দিষ্ট করেছেন যে হাত ধরে আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষ পরকালেও বিচারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো। আমার মনে হলো রওজা মুবারকের পাশে রিয়াজুল জান্নাতের অংশটুকু এই পাপে পূর্ণ পৃথিবীতে বেহেশতেরই বাগান; প্রকৃতই শান্তির এক টুকরো জমি। আমি এর আগেও সেখানে গেছি। অনেকবার। কিন্তু এই তীব্র মানসিক অনুভূতি উপলব্ধি করি নাই। পিতা ও পুত্রের জীবনে সেই আধাঘন্টা ইবাদতের সময়টুকু আমাকে মৃত‍্যুর পরবর্তী জীবনের জন‍্য কিছুটা সঞ্চয় করিয়েছে। ২০০৪ সালে ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার পুত্র ও কন‍্যার জন‍্য একা হাত তুলেছিলাম ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে এবার আমি স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। তিনি না চাইলে আমরা কখনোই একসাথে সেখানে যেতে পারতাম না। আমি পূণ‍্যবান নই। আমি কেবল কখনো হারাম বস্তু স্পর্শ করি না। সাধ‍্য অনুযায়ী ইবাদত করি। আমার কাছে উপাসনা স্রষ্টার ক্ষমা ও নৈকট‍্য লাভ ও স্রষ্টার প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশের উপায়। আমি আল্লাহর সাধারণ পাপী বান্দা। আল্লাহ আমার হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার জন‍্য নিষ্পাপ কোমল বিশেষ এক শিশু, আমার পুত্রকে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন। এজন‍্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম। আমার চোখে পানি দেখে আমার ছেলে সেটা মুছিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো বাবা; ব‍্যাথা? বাবা কোথায় ব‍্যাথা! আমি তাকে বলতে পারি নাই এই অশ্রু তার হাত ধরতে পারায় আনন্দের অশ্রু। আমি এতো সাধারণ হয়েও অসাধারণ হয়েছি তার হাত ধরতে পারায়। আমরা বুঝি না। অধৈর্য হই। সৃষ্টিকর্তা রহস‍‍্যময়। তিনি এক অনির্বচনীয় উপায়ে তার করুণাধারায় আমাদের নিমজ্জিত করেন। বিশ্বাসীদের অন্তরকে তিনি তার নিদর্শন উপলব্ধি করার জন‍্য খুলে দেন। আমি প্রার্থনা করলাম কোরআনের সেই আয়াতগুলি স্মরন করে যেখানে তিনি অবিশ্বাসীদের হৃদয় সীলমোহর করার কথা বলেছেন। সম্মান ও সম্পদ যে তিনি ইচ্ছামতো দেন ; যাকে ইচ্ছা দেন অথবা নিয়ে নেন সেই কথা বলেছেন। আমি ও আমার পুত্র যখন প্রার্থনা শেষে ফিরছি ; সেই পুরো পথ সে আমাকে হাত ধরে নিয়ে এলো। আমরা কোনো কথা বলি নাই। কিন্তু আমাদের হৃদয় কি বলছিলো সেটা আমরা দুজন ছাড়া কেবল স্রষ্টাই জানেন।🌹🫶 ©️আব্দুর নূর তুষার এর টাইমলাইন থেকে নেওয়া🌹

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...