স্কুল লাইফে একবার অংকে ১০০ তে ৩১ পেয়েছিলাম!! স্যারের চরম বেতের বাড়ি তো খেয়েছিলামই, বাসায় এসে অপেক্ষা করছিলাম বাবার মাইরের জন্য আমার বাবা এলো রাতে। এসে রিপোর্ট কার্ড দেখতে চাইলো। আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো। আমি তখন ক্লাস সেভেনে। আমার বাবা কতো আগ্রহ করেই না রিপোর্ট কার্ড চেয়েছে। মাথা নিচু করে বাবার সামনে বসে আছি। চোখে পানি অনেকক্ষন ধরে রিপোর্ট কার্ড দেখে বাবা আমাকে বল্লো, তুমি তো ইংরেজী তে অনেক ভালোই করেছো? ১০০ তে ৭২!!! সমাজেও ৮১!! অংকে তো ধরা খেয়ে গেলা! শোন! কাল থেকে অংক আমার সামনে করবা। রেগুলার। অংকে যদি তৃতীয় পার্বিক পরীক্ষায় ৮০ পাও, তোমাকে যে কী কিনে দিবো চিন্তাও করতে পারবা না। আর যদি ফেল করো! তোমার পড়াশুনা বন্ধ। "আমার এক জবান!!!" শুরু হলো বাবার সাথে আমার অংক চর্চা। প্রতি দিন অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে উনি বসতেন পাটি গনিত আর বীজগনিত নিয়ে। আমার চেয়ে আমার বাবার পরিশ্রম অনেক বেশী হতো। পরীক্ষার পর রেজাল্ট এলো। আমি প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরলাম আমি অংকে ১০০ তে ৭২ পেয়েছি। বাবা কে রিপোর্ট কার্ড দেখানোর সময় সেই কী কান্না আমার!!! আমার বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বল্লো, কোনো সুপার ম্যান ও ৩১ থেকে ৮০ পায় না দুই মাসের চর্চায়। তুমি তো ৭২ পেয়েছো!! তোমাকে আমি ৮০ র টার্গেট কেনো দিয়েছি জানো? কারন যেই তুমি ৩১/৪০ পেয়ে মন খারাপ করতা না, শুধু টেনশন করতা বেতের বাড়ির, আজ সে ই তুমি ৮০ পাওনি বলে কান্নাকাটি করছো। কারন তোমার মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। এখন তুমি বুঝতে পেরেছো, তুমি আসলে ৮০ পাবার যোগ্য। সেই সন্ধ্যায় বাবা আমাকে নিয়ে স্টেডিয়াম মার্কেট গিয়ে "সেগা ড্রাইভ" (টিভি তে চলা ভিডিও গেইম) কিনে দিলো। বাবার এই আচরন আমার মনে প্রচন্ড প্রভাব ফেলেছিলো। আমাকে আমার বাবা কখনোই চাইবার সাথে সাথে কিছু কিনে দিতো না। শর্ত জুড়ে দিতো। শর্তে হেরে গেলে আমি সে জিনিস টা পেতাম না। আর মন খারাপ ও করতাম না। কারন, আমার মনে হতো, আমার ব্যার্থতার কারনে আমি জিনিস টা অ্যাচিভ করতে পারিনি। এস,এস,সি তে আমার খুব ভালো রেজাল্ট করার বিন্দু মাত্র আশা ছিলো না। কিন্তু আমার বাবার আশা ছিলো। আর বাবার সেই আশার শক্তি এতোই বেশী ছিলো যে আমি এস,এস,সি তে প্রচন্ড ভালো রেজাল্ট করি। বাবা পচিশ কেজি মিষ্টি কিনে নিজের হাতে সবার বাড়ি বিলিয়েছিলো। এইচ,এস,সি তে চার টা লেটার সহ ভালো করতে পারলে শর্ত ছিলো সব চেয়ে দামী সিডি হাই ফাই প্লেয়ার আমাকে কিনে দেয়া হবে। আমার বাবা আবার এই ব্যাপারে প্রচন্ড লেভেলের এককথার মানুষ। আমার রেজাল্ট আশানুরূপ হলো। ঠিক তার পরের দিন সনি শোরুম থেকে আমি আম্মা আর বাবা কিনে নিয়ে এলাম সনি জি,আর এইট মডেলের সুপার হাই ফাই সিস্টেম। এরপর এলো ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধ। এস,এস,সি, এইচ,এস,সি এক রকম চ্যালেঞ্জ। ভর্তি পরীক্ষা পুরোই ভিন্ন। জীবনের মোড় পরিবর্তন করে দেয়া একটা অধ্যায়। আমি বন্ধু বান্ধব, আড্ডা, গান এই সব নিয়ে মেতে গেলাম। এক রাতে আমার বাবা আমাকে বল্লো, বাবা রে, আমি মধ্যবিত্ত মানুষ। তোমাকে দামী প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে পড়ানোর টাকা আমার নেই। সামর্থ্য ও নেই। তুমি একটু মন দিয়ে পড়াশুনা কর, আমি জানি, আমার ছেলে ভালো কোথাও চান্স পাবে। যে ছেলে অংকে ৩১ থেকে এস,এস, সি তে ১০০ তে ১০০ পেতে পারে, সে ছেলে চেষ্টা করলে সব ই পারে। বাবা চোখ টা চকচক করে বল্লো, তুমি যদি ভালো ভার্সিটি তে চান্স পাও,স্পেশালি বুয়েট বা মেডিকেল, আমি তোমাকে তোমার টেবিলে আঠা দিয়ে লাগানো সেই কম্পিউটার টা কিনে দেবো। আমার বাবা সবই লক্ষ্য করে। আমার খুব স্বপ্ন ছিলো আমার নিজের একটা কম্পিউটার হবে। বলতে সাহস পেতাম না। তাই ছবি কেটে টেবিলে সেঁটে রাখতাম। আমার বাবা আমার হাত দুই টা শক্ত করে ধরলেন বিশ্বাস করেন!!! আমি মাত্র দুই টা ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কিনেছিলাম। বুয়েট আর মেডিকেল। আমি দুই টা তেই চান্স পেয়েছি। গর্ব করে বলছি না। আমি অ্যাভারেজ স্টুডেন্ড। কিন্তু আমাকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো আমার বাবা। আমি যা, তার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী মনে করিয়ে দিতো আমার বাবা। ভাত খেতে বসলে বাবার দুই পাশে আমি, আমার বোন রা বসতাম। উনি মাছ মাংস যা ছিলো, ভেঙে ভেঙে তার ছেলে মেয়ে পাতে তুলে দিতো। এতেই উনার প্রচন্ড তৃপ্তি হতো। নিজে যেমন তেমন শার্ট পরুক, ছেলে মেয়ে কে সব চেয়ে ভালো পোশাক টা কিনে দিয়ে বলতো, ভুলে যেও না তোমরা কাজী শারফুদ্দিনের ছেলে মেয়ে। আমার মেডিকেল ভর্তি ক্যান্সেল করে বুয়েটে ভর্তি হবার এক মাসের মধ্যেই হাই কনফিগের ডেস্কটপ পিসি চলে আসে আমার টেবিলে। আমি জানি এই পিসি কিনতে বাবার যে কত টা কষ্ট হয়েছে। কিন্তু পিসির পাশে বসে যখন আমি আনন্দে বার বার চোখ মুছছিলাম, বাবা তাকিয়েই ছিলো। আর বলছিলো, এই কম্পিউটারের জন্য আরো কিছু লাগবে? লাগলে বলবা। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কম্পিউটার বলে কথা!! আমার বাবা একজন গ্রেট মোটিভেটর। শুধু বুলি কপচিয়েই চলে যেতেন না। পাশে বসে ভুল শুধরে দিতেন। আমার বোন যখন ইন্টারে আশানুরূপ ফল করতে পারলো না। আমার বাবা, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো, এটা তো জাস্ট একটা ছোট্ট ব্যাপার, আমার মেয়ে যে কত দূর যাবে! তা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি!!! আমার সেই মেজো বোন, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স থেকে অনার্স মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস, এরপর ইউ,কে থেকে বার এট ল করে এখন লন্ডনের ব্যারিস্টার। এই সব কিছুই সম্ভব হয় একজন বাবা, না, না, একজন অতিমানব পিতার জন্য। এভবে প্যারেন্টিং আমাদের যুগে সত্যিই বিরল ছিলো। আমার বাবা, সেই কাজ টা করিয়ে দেখিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে বাবা মা এর বাসায় যাই, আড্ডা, খোজখবরের জন্য। আমি আমার বাবার বাড়ি থাকি। উনারা দুই তলায় আর আমি চার তলায়। তিন তলায় আমার বড বোন। মাঝে মাঝে বাবার বাড়ী যাই বলতে বুঝিয়েছি, ফ্রিকুয়েন্টলি অফিসের জন্য না যাওয়া হলেও এক দিন পর পর ই যাওয়া হয়। ফিতে আসার সময় এখনো আমার মা আমার হাতে একটা এক লিটারের কোক বা স্প্রাইট গুজে দেয়। কত্ত বার না করি। এর পর ও দেয়। কারন সেই সবুজ বোতল ভরা স্প্রাইট থকে না, আমার মা, বাবার নিখাদ ভালোবাসা থাকে। সেই বোতলে চুমুক দিয়ে আমার এখনো মন টা জুড়িয়ে যায়। আমার বাবা এখনো আমি একটু নিরাশায় মুশড়ে পড়লে আদর করে বলে, বাবা রে জীবন টা ই,সি,জির কার্ভের মতো। উঠে নামে। স্ট্রেইট লাইন হলে কি মানুষ বেচে থাকে??? ভালো থেকো আমার ভালোবাসার মা-বাবা। - সাব্বির আহমেদ ইমন

Comments
Post a Comment