Skip to main content

প্রবাসীর ত্যাগের ঈদ

 প্রবাসীর ত্যাগের ঈদ


ডিউটি থেকে ফিরে বাসায় ফিরে দেখলাম আমার রুমমেট পারভেজ উবু হয়ে শুয়ে আছে। হালকা নড়াচড়া করতে দেখে বুঝলাম সে জেগেই আছে। গতকাল ঈদের নামাজের পর থেকে সে এভাবেই শুয়ে ছিল। আজোও এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ভাবলাম, হয়ত সে অসুস্থ। তার বেডের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, পারভেজ শরীর স্বাস্থ্য ভাল তো?? সে একটু নড়াচড়া করে জবাব দিল হা ভাই ভাল। আমি আর কথা বাড়ালাম না। হায়রে! জীবন আমার বাড়িতে পোলাও, মাংস খাবার মত মানুষ নেই আর আমি এখানে আলুর ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাই। এই কথাটা শুনে, পাশে তাকিয়ে দেখি পারভেজ ভাত খাচ্ছে আর স্বগতোক্তি করছে। আমি পাশেই বসে একটি মজার বই পড়ছিলাম। আমার অবসর সময় বেশীরভাগ কাটে বই আর পত্রিকা পড়ে। পড়ায় মনোনিবেশ করতে পারছি না তার আলুর ভর্তা, পোলাও, মাংসের কথাগুলো বারবার মস্তিষ্কে তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। বই পড়া বন্ধ করে তার পাশ ঘেষে বসলাম। তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম ভাইয়া কি দিয়ে ভাত খাচ্ছো? সে দুই ঠোঁটে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, এই যে আলুর ভর্তা আর ডিম ভাজি। জানেন আমার বাড়িতে পাতিল ভর্তি নানা পদের খাবার রান্না করে রেখেছে, কিন্তু খাবারের মানুষ নেই। আমি পারভেজের সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।যদিও একই রুমে থাকি অনেকদিন যাবত।আসলে প্রবাসে একই রুমে একই সাথে থাকলে দুই একজন ছাড়া বাকি সবার সম্পর্কে জানা খুবই দূরহ। কারন সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। খুব ভোরে ডিউটিতে যাওয়া আবার সন্ধ্যায় অনেক সময় রাত এগোটায় বাসায় ফিরা, রান্না করা, খাওয়া, বাড়ির সবার সাথে কথা বলা এভাবেই কেটে যায় দিন। একজন আরেকজনের অতীত সম্পর্কে জানার সময় নাই। বর্তমানই ঠিকমত জানা হয় না। -তোমার ভাইবোন কয়জন?? জিজ্ঞেস করলাম আমি। -ভাইবোন নাই আমি একাই। মুখের ভাত গিলতে গিলতে জবাব দিল পারভেজ। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান বিদেশে তাহলে তার বাবা, মা আসলেই খুব দু:খী। কিছুক্ষন পর আবার জিজ্ঞেস করলাম। -বাড়িতে কে কে আছে? -মা, বাবা। সংক্ষিপ্ত ভাবে জবাব দিল সে। -বাড়িতে কথা হয়েছে আজ!! -সকালে মায়ের সাথে কথা হয়েছিল আর কথা বলার পর থেকেই মন খারাপ কিছু ভাল লাগছে না।।সকালে মা কি বলেছে জানেন ভাই? আমি চুপ করে তার কথা শুনছি, কিছু বললাম না। সে নিজেই নিজেই আবার বলতে লাগল। মা বলল," বাবা তুই নাই তাই চিন্তা করছি আজকে রান্না করব না। তোরে ছাড়া ঈদ ঈদের মত লাগে না। আর কুরবানির মাংসও খাব না যতক্ষন পর্যন্ত না তুই খাবি। তোর ওখানে কেউ গেলে জানাইস। আমি কুরবানির মাংস পাঠাব। তুই যেদিন খাবি সেদিন আমিও খাব। তুই না খাওয়া পর্যন্ত আমি কুরবানির মাংস ছুঁইব না। দেখলাম পারভেজের দুই চোখে পানি। সে জামার হাতায় চোখের পানি মুছে বলল, মায়ের এই কথা শোনার পর আমি কোন জবাব দিতে পারিনি। কি জবাব দিব বলেন। মায়ের ভালবাসা যে কি তা আপনাকে বুঝাতে পারব না । তাই সারাদিন না খেয়ে শুয়ে ছিলাম। আমি বললাম, এখন বাড়িতে ফোন দিয়ে খবর নাও তোমার মা হয়ত এখনো না খেয়ে আছে। পারভেজ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মুখের ভাতটা গিলে, পানি খেয়ে মোবাইল হাতে নিল কল করার জন্য আমি বললাম, 'থাক খাবার পরই ফোন দিও। পারভেজ বলল, না ভাই, এখনই ফোন দেই দেখি মা খেয়েছেন কিনা। সে কল দিল ওপাশে কল রিং হচ্ছে। পারভেজ লাউডস্পিকার অন করে কথা বলছে।দুজনের কথোপকথন আমি শুনতে পাচ্ছি। পাভেল মায়ের সাথে কিছুক্ষন কথাবার্তা বলল। এক পর্যায়ে ওর মা জানতে চাইল বাবা ভাত খেয়েছো? পাভেল সংক্ষিপ্ত জবাব দিল হা মা খাচ্ছি। ওর মা জানতে চাইল ছেলে কি তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছে। এই প্রশ্নে পারভেজ থতমত খেয়ে গেল।এক পলক আমার দিকে আরেক পলক খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, মা আমি পোলাও, মাংস, মাছ আর ডাল দিয়ে ভাত খাচ্ছি। ওর জবাব শুনে ফোনের ওপাশে কিছুক্ষন নীরবতা! পারভেজ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবতা ভেঙ্গে ওর মা বলল, কেন মিথ্যে বলছিস? আমার সাথে। তুই আমাকে পেটে ধরেছিস নাকি আমি তোকে পেটে ধরেছি। আমি জানি তুই কি দিয়ে ভাত খাচ্ছিস। আমার এ বিদেশ করা লাগবে না তুই দেশে চলে আয়। ওর মা আর কিছু বলতে পারল না। মনে হচ্ছে মা কাঁদছেন। পারভেজের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ফোনের লাইনটা কেটে দিয়ে পারভেজ আমার দিকে তাকিয়ে বলল "এই জন্যই ভাই বাড়িতে ফোন দেই নাই। বাড়িতে কোন উৎসব হলে মা ফোন দিয়ে এভাবে কান্না করে আর আমিও তার সাথে কেঁদে ফেলি। আমি বললাম "ভাই তুমি মা বাবার একমাত্র সন্তান তোমার বিদেশ থাকা মানায় না। পারভেজ চোখের পানি মুছে বলল, আমি কেন এখানে পড়ে আছি সেটা আমি ছাড়া ভাল কেন জানে না। আপনি কেন এখানে একাকী পড়ে আছেন সেটাও আমি জানি না। যার যার সমস্যা সেই বুঝে।ইংরেজিতে প্রবাদ আছে "The wearer best known where is shoes pins " আমি কিছু বলতে পারলাম না শুধু বললাম তোমার তো মা আছে, আমার তো মা নেই যে আমার জন্য দু'ফোটা চোখের জল ফেলবে। ফোন দিয়ে কি খেয়েছি তা জিজ্ঞেস করবে।আমার কথা শুনে পারভেজ তার দু:খ ভুলে দুই ঠোটে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল" ঈদ মোবারক ভাই "কথার মোর ঘুরিতে দেওয়াতে আমিও হেঁসে জবাব দিলাম " ঈদ মোবারক " collected

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...