সকালটা শুরু হয়েছিল আর প্রতিদিনের সকালের মতই, কিন্তু আসলে ছিল অন্যরকম যা জানা ছিলোনা কারো। রোজকার মত সকাল হতেই ছেলেকে ডাকতে দরজা খুলে রুমে ঢুকলো মা। যা দেখল - দৃশ্যমান এই বিভীষিকার কাছে পৃথিবীর কোন কিছুর তুলনা হয় না। তাদের এত কষ্টে তিলে তিলে গড়ে তোলা আদরের সন্তান কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিল!? বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশেও ক্রমশ বাড়ছে আত্মহত্যার হার। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ১১,০৯৫ জন আত্মহত্যা করেছে, মানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন! প্রতিদিন আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করছে আরো দ্বিগুণ! এরা প্রত্যেকেই কারো না কারো অতি আপন জন, কাছের কেউ। আপনার অবস্থান থেকে আপনি কতটুকু করতে পারেন আপনার আপনজনের জন্য, এটা জানা আপনার জন্য জরুরী। প্রথমত, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন যে যারা আত্মহত্যার কথা মুখে বলে তারা সাধারণত আত্মহত্যা করে না। কারণ ৮০% আত্মহত্যাকারী তাদের মনো:কষ্টের কথা কাওকে না কাওকে জানায় অথবা এমন কোন আচরণ করে যাতে বোঝা যায় সে কতখানি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আপনার বন্ধু-বান্ধবী বা আপনজনের এই ব্যাপারগুলোর প্রতি মনোযোগ দিন। দ্বিতীয়ত, নিজের টিনএজার সন্তানদের সাথে আত্মহত্যার ব্যাপারে কথা বললে তাদের ঝোঁক বাড়বে - এমন ভাববেন না। বরং তাদের শরীর খারাপ থাকলে যতটুকু মনোযোগ প্রদর্শন করেন, মন খারাপ থাকলেও জানার চেষ্টা করুন কেন তার মন খারাপ। সন্তানকে নিজের ক্ষতি করার অসুবিধা বুঝান, সে না থাকলে আপনাদের কতখানি কষ্ট হবে বলুন; তার অবস্থান আপনাদের জীবনে কতখানি মূল্যবান এটা তাকে উপলব্ধি করান। তৃতীয়ত, মানুষ আত্মহত্যাপ্রবণ হলে সারা জীবনই আত্মহত্যাপ্রবণ থাকবে এটা ঠিক নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাৎক্ষণিক কষ্ট থেকে মুক্তি লাভের পথ হিসেবে নিজের জীবননাশের কথা চিন্তা করে। তাহলে আমাদের কষ্টের পাহাড়ের চূড়া থেকে অনুভূতিগুলোকে নিচে নামার সুযোগ দিতে হবে। শুধুমাত্র সিদ্ধান্তগুলোর নেওয়ার আগে সামান্য চিন্তা করে নিলে অর্ধেকেরও বেশি আত্মহত্যার হার কমে যাবে! চতুর্থত, যে ব্যক্তিটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে তাকে আর কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব না, একবার বাঁচলে সে বারবার চেষ্টা করবে এবং পরিশেষে সে একদিন মারা যাবে - এই বহুল প্রচলিত মতামতটি প্রায় সম্পূর্ণই ভুল। কারণ অধিকাংশ মানুষই আত্মহত্যার চেষ্টা মরে যাওয়ার জন্য করে না, বরং তাৎক্ষণিক কষ্ট থেকে মুক্তি লাভের জন্য করে। যদি তার সমস্যার সমাধান করা যায় বা তাকে খাপ খাওয়ানো যায় অথবা চিকিৎসা দেয়া যায়, সেও জীবনে আশাবাদী হতে পারে। পঞ্চমত, আমরা মনে করি, নিজের জীবননাশের চেষ্টা সেই করে যে বহুদিন ধরে বিষন্নতায় ভুগছে। কিন্তু যদিও বিষণ্নতা খুবই কমন এবং অবশ্যই আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে অনেকেই বিষণ্নতার কারণে এ পথ বেছে নিচ্ছে, কিন্তু বিষণ্নতা বাদেও আরো অনেক কারণে মানুষ এ ভয়ঙ্কর পন্থা অবলম্বন করতে পারে। তাই একজন মানুষ আমার সাথে গতকালকে হেসে কথা বলেছে তাই আজকের জীবননাশের মতো একটি ভয়ংকর কাজ করতে পারে না - ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। মেঘের আড়ালে যেমন সূর্য লুকিয়ে থাকে, তেমনি হাসির আড়ালেও লুকিয়ে থাকে ভয়ঙ্কর কষ্ট আর বিষন্নতা। পরিশেষে, আত্মহত্যা অবশ্যই কোন সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু সব সময় আসলে মানুষ সমাধান খোঁজেও না।এমন সময় আসতেই পারে যে আত্মঘাত বাদে আর কোন রাস্তার দেখা নেই; কিন্তু বিশ্বাস করুন সামান্য অপেক্ষা করলেই আপনার সামনে অনেকগুলো পথ খুলে যাবে।তাহলে বলুন, কিসের টানে আপনি সাত রঙের রঙিন দুনিয়া ত্যাগ করে সাদা-কালো কে বেছে নিচ্ছেন? কিসের মায়ায় আপনি চরম মায়ার এই জগৎ ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছেন? আজকে হয়ত আপনার ইচ্ছামত কিছু হচ্ছে না, কালকে হবে, পরশু হবে। একমাত্র বেঁচে থাকলেই আপনার সুযোগ থাকবে জীবন আপনার মত করার, কিন্তু মরে গেলে আসলেই সব শেষ! আত্মহত্যা কখনোই কষ্ট শেষ করে না, আপনার কষ্টটা আপনার আপনজনকে দিয়ে দেয়। আপনার গল্প লেখার কাগজ-কলম উভয়ই আপনার হাতে, এখন আপনি বলুন আপনার গল্পের শেষটা আপনি কিভাবে চান?

Comments
Post a Comment