Skip to main content

ইসলামের সৌন্দর্য (পঞ্চম পর্ব)


এক লোক একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। ইদানীং সে নিজের উপর, তার কাজের উপর খুব বিরক্ত। কিছুতেই মন বসে না। একদিন তার বিরক্তি সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলো। সে রাগে অফিসের ল্যাপটপ ভেঙ্গে ফেললো, অফিসের ফাইলপত্র পুড়িয়ে ফেললো, কাচের গ্লাস, জানালা ভেঙ্গে ফেললো। একেবারে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।

কিছুক্ষণ পর যখন স্বাভাবিক হলো, তখন বললো- ‘এ কী করলাম!’ অথচ ততোক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। সে চুপিসারে বাসায় চলে আসলো। মনে মনে চিন্তা করছে তার কী শাস্তি হতে পারে। শাস্তির একটা লিস্ট করে ফেললো। চাকরি চলে যাবে। জরিমানা দিতে হবে। কতো টাকা? পাঁচ লক্ষ? দশ লক্ষ? জেলে যেতে হবে। কিছুদিন পর পরিবার নিয়ে পথে বসবে। সে অপেক্ষা করছে পুলিশ এসে তাঁকে হাতকড়া পরাবে। সে অফিসে বসের অবাধ্যতাই শুধু করেনি, ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। তার তো এখন উচিত শিক্ষা হবে। দরজায় একজন নক করলো। সে নিশ্চিত দরজা খুলে দেখবে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ধীর পায়ে দরজা খুলতে গেলো। ঘামে তার পুরো শরীর ভিজে গেছে। দরজা খুলে দেখলো অফিসের পিয়ন এসেছে। পিয়ন একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, “বস আগামীকাল আপনাকে অফিসে যেতে বলেছেন। আপনি যা করেছেন তা তিনি মাফ করে দিবেন। শুধু একবার ‘সরি’ বললেই হবে।” লোকটি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পিয়ন এসব কী বলছে? নাকি সে স্বপ্ন দেখছে? তার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? শরীরে একটা চিমটি কেটে দেখলো সব ঠিক আছে। তার সামনে পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। পিয়নের কথার প্রমাণস্বরূপ বস একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন। চিঠিতে কোম্পানির সিলমোহর, বসের স্বাক্ষর আছে। চিন্তা করুন, লোকটি এতোটা ঘোরতর অপরাধ করার পর ক্ষমাপ্রাপ্তির এমন ঘোষণা শুনে কতোটা আনন্দিত হবে? এমন অপরাধ করলে কি ক্ষমা করে দেওয়া তো দূরে থাকুক, এতোক্ষণে তার জেলে থাকার কথা। সেখানে তার চাকরিও আছে, কোনো ক্ষতিপূরণও দিতে হচ্ছে না, জেলেও যেতে হচ্ছে না, আবার ক্ষমাও পেয়ে যাচ্ছে! ইসলামে দুনিয়াতে যেসব শাস্তি আইন আছে তার বেশিরভাগই কোনো মানুষের অধিকার হরণের জন্য, কষ্ট দেবার জন্য। যেমন: চুরির শাস্তি হিশেবে হাত কাটা, যিনা-ব্যাভিচারের শাস্তি হিশবে প্রস্তরাঘাত, হাতের বদলে হাত, খুনের বদলে খুন ইত্যাদি। কিন্তু, আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার জন্য দুনিয়াতে শাস্তি খুব কম। যেমন ধরুন, কেউ নামাজ পড়ে না, রোজা মাসে লুকিয়ে লুকিয়ে খায়, হারাম কাজে লিপ্ত (সিনেমা দেখে, মিথ্যা কথা বলে, গীবত করে)। আল্লাহর ইবাদাত না করার জন্য আল্লাহ দুনিয়াতে তাঁর বান্দাকে ঐভাবে শাস্তি দিচ্ছেন না; যতোটা দিচ্ছেন মানুষের হক্ব নষ্ট করলে। তারমানে, যে হারামে লিপ্ত, আল্লাহর অবাধ্য, আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে শাস্তি না দিয়ে তার জন্য দরজা খোলা রাখছেন। সে যদি ফিরে আসে, আল্লাহ তাকে স্বাগতম জানাচ্ছেন। উপরের লোকটির কথা চিন্তা করুন। সে তার অফিসের নিয়ম ভঙ্গ করলো, বসের অবাধ্য হলো এবং ধরেই নিলো তার আর ক্ষমা নেই। ঠিক তখন জানতে পারলো যে, সে যদি ‘সরি’ বলে তাহলে তার বস তাকে ক্ষমা করে দিবেন। যে এতো খারাপ কাজ করলো সে কোম্পানির সাথে, সেই কোম্পানি তার জন্য দরজা বন্ধ না করে তাকে উল্টো বরণ করে নিচ্ছে? তার কতোটা খুশি হওয়া উচিত? মানুষও তো এমন। সে আল্লাহর অবাধ্য হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌছে যায় যে, তার সামনে আর কোনো পাপাচার বাকি থাকে না। যতো ধরণের পাপাচার করা সম্ভব সব সে করেছে। সবকিছু যখন শেষ হয়ে যায়, হঠাৎ তখন তার বোধোদয় হয়- ‘এ আমি কী করলাম?’ তার মনে হয়, সে এমন পাপাচারে লিপ্ত ছিলো যেটা আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। সে এক পর্যায়ে আল্লাহর রহমত থেকেই নিরাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু, আল্লাহ কী বলেন? আল্লাহ কি তাকে নিরাশ হতে বলেন? আল্লাহ বলেন: “ও আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।” [সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩] পাপ করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে আল্লাহ পূর্বের পাপগুলো ক্ষমা করে দেন। এরচেয়ে উত্তম সুসংবাদ আর কী হতে পারে? অপরাধ করে অফিসের বসকে ‘সরি’ বললে বস সর্বোচ্চ ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু তিনি কি ‘সরি’ বলার জন্য খুশি হবেন? নিশ্চয়ই না। যে তার এতো বড়ো ক্ষতি করলো, তিনি কেনো তার উপর খুশি হবেন। কিন্তু, আল্লাহ তাঁর তাওবাকারী বান্দাকে শুধু ক্ষমা করেই দেন না, তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন।” [সূরা বাকারা ২:২২২] যে আল্লাহ আমাদেরকে এতো ভালোবাসেন, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে কিসের এতো লজ্জা? অমার্জিত অপরাধ করা সত্ত্বেও যখন শুনি স্রেফ ‘সরি’ বললেই তিনি মাফ করে দিবেন, তখন আমরা দৌড়ে যাই তাকে ‘সরি’ বলতে। আর রাতদিন আল্লাহর অবাধ্য হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ যেখানে ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন, সেখানে আমরা কেনো ক্ষমাপ্রার্থনা করবো না? ক্ষমা চাইলে আল্লাহ শুধু ক্ষমাই করবেন না, ক্ষমাপ্রার্থীকে ভালোবাসবেন। ইসলামের সৌন্দর্য হলো- ইসলাম আশাবাদী হতে উৎসাহিত করে। হতাশার তিমির ছিন্ন করে আশার আলোর হাতছানি নিয়ে ইসলাম আমাদের সামনে হাজির হয়। প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়। ইসলামের সৌন্দর্য (পঞ্চম পর্ব) আরিফুল ইসলাম

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...