"আমি লক্ষ্য করতাম, মাঝে মাঝেই তিনি কেমন যেন উদাস হয়ে যেতেন। অনেক সময় একান্তে বসে তাকে কাঁদতে দেখেছি। তার এমনই একটা দুর্বল মুহূর্তে আমি তাঁকে ধরে ফেলেছিলাম।
শেষপর্যন্ত অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি তাঁর বুকের ভাজ কিছুটা লাঘব করেছিলেন আমাদের দু'একজনের সামনে। ধরা গলায় বলেছিলেন, "কাশগরের সর্বাপেক্ষা বড় আমির ছিলেন আমার আব্বা। তিনি ছিলেন একজন বড় আলেম এবং খুব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। আমার বড় এক ভাই এবং দুই বোন ছিল। বিপ্লব সাধিত হওয়ার পর সারাদেশের গণ্যমান্য সব মুসলিম নেতৃবৃন্দের সাথে আমার আব্বাকেও গ্রেফতার করে নিয়ে গেল কমিউনিষ্ট সন্ত্রাসীরা। অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে ওরা আমার বড় ভাই এবং দুইবোনকেও ধরে নিয়ে গেল। তারা আর ফিরে এলেন না। কোথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এখবর উদ্ধার করা যায়নি। আমাদের বাগান, খামার, পশু পাল এবং সহায়-সম্পদের সবকিছুই দখল করে নেয়া হয়েছিল। আমাকে এবং আমার আম্মাকে খামারের একটা ছোট বাড়ি দেওয়া হল থাকার জন্য। আম্মা ততদিনে শোকে-বেদনায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। আমার বয়স তখন চৌদ্দ-পনেরো বছর। ভালো মন্দ সব কিছুই বুঝবার ক্ষমতা হয়েছে। বিশেষত আমরা যে একেবারে নিঃস্ব ধ্বংস হয়ে গেছি এতোটুকু অন্তত আমি বুঝতে পারছি। এমনই অবস্থাতেই এক রাতে আমার এক মামা গোপনে আম্মার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তিনি খবর দিলেন, কিছু সংখ্যক সাহসী মুসলিম যুবক একটি গোপন দল গঠন করে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছে। উদ্দেশ্য কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসীদের শ্যেন দৃষ্টি থেকে অবশিষ্ট মুসলমানদেরকে যথাসম্ভব আড়াল করে রাখা এবং তাদেরকে দেশ ছেড়ে অন্যত্র হিজরত করার সুযোগ করে দেয়। তিনি আরো খবর দিলেন দু-একদিনের মধ্যেই একটি কাফেলা হিন্দুস্তানের পথে রওনা হয়ে যাবে, আমাকে যেন সেটা ফেলার সাথে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আম্মাকেও দেশ ছাড়ার জন্য বলা হয়েছিল, কিন্তু দুটি বোন এবং আমার বড় ভাইয়ের আশা তিনি তখনও ছাড়েননি।হয়তো ওরা জালেমদের হাত থেকে ছাড়া পাবে অথবা অন্তত একটা খবর আসবে।নির্ধারিত সময়ে একটা পুটলি হাতে দিয়ে আমাকে কাফেলার সঙ্গী করে দেয়া হলো। সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না।সন্ধ্যা রাতের আবছা অন্ধকারে মা আমাকে কিছুদূর এগিয়ে দিতে এসেছিলেন।শেষটায় একটা টিলার উপর দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বিলীয়মান কাফেলাটির দিকে। শেষ বারের মত মায়ের কন্ঠ শুনতে পেয়েছিলাম, চিৎকার করে আমার নাম ধরে ডাকছেন। আমাদের কাফেলা টি তখন পাহাড়ি পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমার পরে যারা দেশ ছেড়ে এসেছিল তাদের মুখে শুনেছি,আমাকে বিদায় দেওয়ার পর মা পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।প্রতিদিনই সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই তিনি পাহাড়ি টিলাটির উপর এসে দাঁড়াতেন। কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে একসময় চিৎকার করে ডাক দিতেন, আব্দুর রহমান! আব্দুর রহমান! শুনেছি,একদিন আমার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে আমার মা টিলাটির উপরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। বিশ্বাস করো, প্রতি সন্ধ্যায় এখনো আমি আমার স্নেহময়ী মায়ের কন্ঠ শুনতে পাই। তিনি যেন আব্দুর রহমান আব্দুর রহমান বলে এখনো ডেকে চলছেন"। এরপর আল্লামা কাশগরী রহ. এর মুখে টুকরো টুকরো অনেক ঘটনাই শুনেছিলাম। মধ্য এশিয়া এবং চীনা তুর্কিস্তানের মুসলমানদেরউপর কমিউনিস্টরা যে অবর্ণনীয় জুলুম অত্যাচার করেছে সেসব একটুকরো বর্ণনা তার মুখ থেকে শুনেছি। একদিন তিনি সেই বিভীষিকার বর্ণনা সম্বলিত একখানা উর্দু বই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন এ বইটি যেন আমি বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়"উসমান বতুর"নামের সেই বইটি আমার হাতছাড়া হয়ে যায়। (১৬৫-১৬৬,জীবনের খেলাঘরে, মাওলানা মহিউদ্দিন খান রহ.)
প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...
Comments
Post a Comment