Skip to main content

আসমা বিনতে উমাইস


হিন্দ বিনতে আউফকে বলা হয় ‘ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শ্বাশুড়ি’। তাঁর মেয়ের জামাই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুরু করে শ্রেষ্ঠ সাহাবী, এমনকি কাফির গোত্রপতি। মাইমুনা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এবং যাইনাব বিনতে খুজাইমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী।

আসমা বিনতে উমাইস (রাদিয়াল্লাহু আনহা), তিনি ছিলেন হিন্দ বিনতে আউফের আরেকজন মেয়ে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর বিয়ে হয় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সাথে। তারা দুজন আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। আবিসিনিয়ায় হিজরতের প্রায় ১২ বছর পর যখন খাইবার বিজয় হয়, আসমা ও জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) মদীনায় ফিরেন। তাঁদেরকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপ্লুত হোন। একদিন আসমা বিনতে উমাইস (রা:) উম্মুল মুমিনীন হাফসার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ঘরে যান। হাফসার (রা:) বাবা উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেখানে উপস্থিত হোন। তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন, “এই মহিলা কে?” হাফসা (রা:) জবাব দেন, “উনি হলেন আসমা বিনতে উমাইস (রা:)।” উমর (রা:) বললেন, “সেই আবিসিনিয়ার মহিলা? (শোনো), মদীনায় হিজরতের মাধ্যমে আমরা মর্যাদার দিক থেকে তোমাদেরকে অতিক্রম করেছি। তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি আমাদের হক বেশি।” উমর (রা:) তাঁকে কথার মাধ্যমে খোঁচা দিলেন! আসমা (রা:) জবাব দেন: “হ্যাঁ, তা আপনি ঠিক বলছেন। আপনারা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের আহার করাতেন আর মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। অন্যদিকে, আমরা ছিলাম এমন এক দেশে, যা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বহুদূরে এবং সর্বদা শত্রু বেষ্টিত। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উদ্দেশ্যেই ছিলো আমাদের এই হিজরত।” আসমা (রা:) জেদ ধরেন। উমর (রা:) তাঁকে যে কথার মাধ্যমে খোঁচা দেন, সেটা তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানাবেন। রাসূলুল্লাহকে না জানানো পর্যন্ত তিনি মুখে দানা-পানি দেবেন না। আসমা (রা:) রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উমরের (রা:) ব্যাপারে ‘বিচার’ দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সুন্দর একটি জবাব দেন: “আমার প্রতি তোমাদের তুলনায় তাঁর (উমর) ও তাঁর সঙ্গীদের বেশি হক নেই (তোমাদের প্রতিই বরং বেশি হক)। কারণ, তাঁর ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য আছে কেবল একটি হিজরত (মক্কা থেকে মদীনা)। অন্যদিকে, তোমাদের জন্য আছে দুটো (মক্কা থেকে আবিসিনিয়া, আবিসিনিয়া থেকে মদীনা) হিজরত।” রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে এমন স্বীকৃতি পেয়ে আসমা (রা:) অনেক খুশি হোন। দুটো হিজরতকারী সাহাবীদের কাছে এই হাদীসটি ছিলো খুবই প্রিয়। তারা আসমার (রা:) কাছে হাদীসটি শুনতে যেতেন। ঐতিহাসিক মূতার যুদ্ধে জাফর ইবনে আবি তালিব (রা:) ছিলেন তিনজনের মধ্যে একজন কম্যান্ডার। সেই যুদ্ধে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। আসমা (রা:) হারান তাঁর প্রথম স্বামীকে। স্বামীর বিয়োগ তাঁকে বেশ কয়েকদিন শোকাচ্ছন্ন করে রাখে। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুরোধে অবশেষে তিনি কান্নাকাটি বন্ধ করেন। জাফরের ঘরে তাঁর তিনজন ছেলের জন্ম হয়। একজনের নাম ছিলো মুহাম্মদ ইবনে জাফর। জাফর ইবনে আবি তালিবের (রা:) ইন্তেকালের ৬ মাস পর আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) –এর সাথে আসমার (রা:) বিয়ে হয়। বিয়েটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়ান। তাঁদের ঘরে একজন ছেলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম ছিলো- মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা:) খলিফা হোন। আসমা (রা:) হোন খলিফা-পত্নী। খলিফা হবার প্রায় ২ বছরের মধ্যে আবু বকর (রা:) ইন্তেকাল করেন। দ্বিতীয়বারের মতো আসমা (রা:) স্বামীহারা হোন। ইন্তেকালের পূর্বে আবু বকর (রা:) ওসিয়ত করে যান, তাঁকে যেনো আসমা (রা:) গোসল করান। আমাদের সমাজে কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে ‘অলক্ষ্মী’ বলে ডাকা হয়, তাকে নানানভাবে হেয় করা হয়। কারো কারো দুটো বিয়ে হলে, দুজন স্বামী অল্প সময়ে মারা গেলে বলা হয়- ‘তুমি/তুই তো স্বামী খেয়েছিস!’ অথচ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা তার ঠিক বিপরীত। স্বামীর স্বাভাবিক মৃত্যুতে স্ত্রীকে তো দোষারোপ করা হয় না, বরং কিছুদিন পর বিধবাকে বিয়ে দেবার জন্য পাত্র দেখা হয়। একবার বিধবা হলে আর বিয়ে করতে পারবে না, এমন ধারণা ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় ছিলো না। আসমা (রা:) দুই-দুইবার বিধবা হবার পরও তৃতীয়বার তাঁর বিয়ে হয়। এবার তাঁর স্বামী হলেন ‘আল্লাহর সিংহ’ নামে খ্যাত আলী ইবনে আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। আলী (রা:) বিয়ে করেন কাকে? তাঁর আপন ভাইয়ের স্ত্রীকে (ভাবী)। আলীর (রা:) পরিবারে বেড়ে উঠেন তাঁর সৎ ছেলেরা; জাফরের (রা:) ছেলে আবু বকরের (রা:) ছেলে। একদিন জাফর ইবনে আবি তালিবের (রা:) ছেলে মুহাম্মদ ইবনে জাফর এবং আবু বকরের (রা:) ছেলে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর ঝগড়া শুরু করেন। একই মায়ের দুই সৎ-ভাই ঝগড়া করছেন তাঁদের বাবাকে নিয়ে। কার বাবা শ্রেষ্ঠ ছিলেন? মুহাম্মদ ইবনে জাফরের বাবা নাকি মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের বাবা? আলী (রা:) দুই ভাইয়ের ঝগড়া দেখতে পান। এই মজার ঝগড়ার বিচার করবেন কে? আলী (রা:) তাঁদের মা আসমাকে (রা:) ডাকলেন। কারণ, দুই ছেলের বাবা তো তাঁরই স্বামী। আসমা (রা:) ছিলেন বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি এমন একটি উত্তর দিলেন, টেকনিক্যালি দুজনকেই সন্তুষ্ট করা গেলো। তিনি বললেন: “আমি আরব যুবকদের মধ্যে জাফরের (রা:) চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি। অন্যদিকে, আরব বৃদ্ধদের মধ্যে আবু বকরের (রা:) চেয়ে ভালো কাউকে পাইনি।” অর্থাৎ, তাঁর যুবক স্বামীর মধ্যে জাফর (রা:) সেরা, বৃদ্ধ স্বামীর মধ্যে আবু বকর (রা:)। এবার তো আলী (রা:) মন খারাপ করলেন। তিনিও তো আসমার (রা:) স্বামী। এক যুবক আর এক বৃদ্ধা যদি সেরা হোন, তাহলে তিনি কী? স্ত্রীকে অভিমানের সুরে জিজ্ঞেস করলেন। আসমা (রা:) আবারও বুদ্ধিদৃপ্ত জবাব দিলেন: “তিনজনের মধ্যে আপনিই সেরা।” আসমা (রা:) বেশ কয়েকটি গুণে গুণান্বিতা ছিলেন। তারমধ্যে অন্যতম হলো- চিকিৎসা বিদ্যা এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা। তিনি ঝাড়ফুঁক জানতেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে ঝাড়ফুঁক দেবার অনুমতি দেন। অন্যদিকে, তিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। যার কারনে, উমর (রা:) প্রায়ই তাঁর কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনতে যেতেন। জীবদ্দশায় আসমা (রা:) তাঁর তৃতীয় স্বামী আলীকেও (রা:) হারান। এর কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন। যিনি ছিলেন দুই খলিফার স্ত্রী আরিফুল ইসলাম

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...